তথ্য অধিদফতর (পিআইডি) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ৫ মে ২০১৯

ফিচার

দেশের উন্নয়নে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক চাই হৃদ্যতাপূর্ণ

মো. আকতারুল ইসলাম

মহান মে দিবস শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের আলোকবর্তিকা। “শ্রমিক-মালিক ঐক্য গড়ি, উন্নয়নের শপথ করি” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দেশে পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস। শ্রমিকের আত্মমর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করার ও ন্যায্য দাবি আদায়ের এক ঐতিহাসিক দিন। ১৮৮৬ সালের এ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমের মর্যাদা, শ্রমের মূল্য এবং দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনে শ্রমিকেরা যে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন তাদের আত্মত্যাগের প্রতি একাত্মতা, শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়ে বিশ্বব্যাপী এ দিবসটি পালিত হয়। এখানে শ্রমিক এবং মালিকের চেতনার জায়গাটি প্রসারিত হয়, সর্ম্পকের উন্নয়ন ঘটে, পারস্পরিক সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হয়। শ্রমিক মালিকের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তথা ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এ বছর মে দিবসের প্রতিপাদ্য নির্বাচন করা হয়েছে। দেশের শিল্পোন্নয়ন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এসডিজিকে সামনে রেখে উন্নত কর্মপরিবেশ, শ্রমিক-মালিকের সুসম্পর্ক, শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষা, পেশাগত নিরাপত্তা ও সুস্থতা নিশ্চিতকরণের কোনো বিকল্প নেই। এ প্রেক্ষাপটে এবারের প্রতিপাদ্য যথার্থ।

শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা, ন্যায়সংগত অধিকার ও কল্যাণের সাথে মহান মে দিবসের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত । শোষণ, বঞ্চনা, লাঞ্ছনা থেকে মুক্তির দীপ্ত শপথে বিশ্বব্যাপী দিনটি পালিত হয়। দিনটি সরকারি ছুটির দিন। প্রতি বছরের ন্যায় এবারো শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের দিনে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ তার জন্মলগ্ন থেকেই আন্তর্জাতিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের পরেই ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর সদস্যপদ লাভ করে। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের ২২ জুন আইএলসি সম্মেলনে ৬টি কোর-কনভেনশনসহ ২৯টি কনভেনশন অনুসমর্থন করে। বঙ্গবন্ধু শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মত্যাগকারী শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে  এদিন ‘জাতীয় শ্রমিক দিবস’ এবং ‘সরকারি ছুটি’ ঘোষণা করেন।

শিল্পায়ন, শিল্পের উৎপাদন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রথম প্রয়োজন শ্রমজীবী মেহনতি মানুষ। শ্রমিক উৎপাদনের অপরিহার্য উপাদান, যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্যে নিহিত থাকে দেশের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। দেশের সম্ভাবনা এবং শ্রমজীবী মানুষের  সুযোগ সুবিধার কথা বিবেচনা করে অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে  বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এবং ২০১৩ সালের সংশোধিত শ্রম আইন যুগোপযোগী ও আধুনিকায়ন করে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করা হয়েছে। দেশের ইতিহাসে  প্রথমবারের মতো ২০১৫ সালে শ্রমবিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি নীতিমালা এবং গৃহকর্মীদের প্রতি লাঞ্ছনা, বঞ্চনা ও নির্যাতন বন্ধের লক্ষ্যে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে।

শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার জন্য সরকার ৪২টি খাতের নূন্যতম মজুরিবোর্ড গঠন করেছে। প্রতিটি কারখানায় অধিকার আদায়ে শ্রমিকরা যাতে সচেষ্ট থাকে, অধিকার বঞ্চিত না হয় সেজন্য ২০১৮ সালের সংশোধিত শ্রম আইনে ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধন সহজতর করা হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম অনলাইনের আওতায় আনা হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশনের জন্য ৬০ দিন সময় নির্ধারণ করা ছিল তা এখন কমিয়ে ৫৫ দিন করা হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধন সহজতর করার ইতিবাচক প্রভাবও পড়তে শুরু করেছে। বর্তমানে সব সেক্টর মিলে ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা ৭,৭৭৫টি; এ সকল ট্রেড ইউনিয়নের সাথে যুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা ২৮ লাখ ৫৫ হাজার ৭৭৯ জন। শুধু গার্মেন্টস ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা বর্তমানে ৭৫৩টি। শ্রম আইন সংশোধনের ফলে কোনো শ্রমিক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করলে ঐ কারখানা মালিক ক্ষতিপূরণ দিতেন একলাখ টাকা, এখন ক্ষতিপূরণ দ্বিগুণ করে দুই লাখ টাকা হয়েছে।

শ্রমিকদের স্বার্থ যাতে বিঘ্নিত না হয় সেজন্য সরকার প্রতিটি কারখানাকে পরিদর্শনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। শ্রম পরিদপ্তরকেও অধিদপ্তরে উন্নীত করা হয়েছে। ২,২৬২টি কারখানায় সেইফটি কমিটি গঠন এবং যে কোনো প্রকার বিরোধ নিষ্পত্তিতে সামাজিক সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছে। সব শিল্পখাতে শ্রমিক-মালিক-সরকার ত্রিপক্ষীয় কমিটি কাজ করছে। এরপরেও বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পের লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে ২০১৭ সালে শুধু গার্মেন্টস শিল্পের জন্য আলাদা ত্রিপক্ষীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। শ্রমিকের যে কোনো সমস্যা সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ, নিষ্পত্তি ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদানের জন্য সার্বক্ষণিক হেল্পলাইন-১৬৩৫৭ চালু করা হয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য কাজ করছে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন। দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু হলে, কোনো শ্রমিক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে কিংবা তাদের ছেলেমেয়ের উচ্চশিক্ষা, নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন সহায়তা এ তহবিল থেকে প্রদান করা হচ্ছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের নির্দিষ্ট ফরমে আবেদন করলে এ সহায়তা পাওয়া যায়। এ তহবিলের এফডিআর ফান্ডের প্রাপ্ত লভ্যাংশ থেকে এখন পর্যন্ত ছয় হাজার পাঁচ’শ জনকে ৩৭ কোটি ৭ হাজার টাকার বেশি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এরপরও এফডিআরসহ এ তহবিলে জমা রয়েছে তিন’শ ২৮ কোটি টাকা।

সরকার শতভাগ রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য ভিন্ন একটি তহবিল গঠন করেছে যার নাম কেন্দ্রীয় তহবিল। গার্মেন্টসকর্মীদের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু, দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা, তাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় সহায়তা এমনকি তাদের বিমার দাবিও এ খাত থেকে পরিশোধ করা হচ্ছে। বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ’র সদস্যভুক্ত কারখানাগুলোর সব শ্রমিককে কেন্দ্রীয় ডাটাবেইজের আওতায় আনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, প্রতিটি শ্রমিক ডাটাবেইজের আওতায় আসলে যে কোনো প্রয়োজনে অতি দ্রুত সহায়তা প্রদান করা যাবে, ফলে কোনো শ্রমিকই অসহায় থাকবে না। সুস্থ কর্মপরিবেশে কাজ করা শ্রমিকদের অধিকার। শ্রমিক অসুস্থ থাকলে উৎপাদনে দারুণভাবে ব্যাঘাত ঘটে। পেশাগত অনেক অসুখ শ্রমিকের মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। পেশাগত অসুখের চিকিৎসায় সরকার পিপিপি’র আওতায় নারায়ণগঞ্জে তিনশ’ শয্যার পেশাগত বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের মধ্যে সকল প্রকার শিশুশ্রম নিরসনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে ২৮৪ কোটি টাকার ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পের (চতুর্থ পর্যায়) কাজ শুরু হয়েছে।

  দেশের বিশাল শ্রমজীবী মানুষের যথাযোগ্য মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শিশুশ্রম নিরসন, ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ, শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্কের মধ্য দিয়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং দ্রারিদ্র্যমুক্ত উন্নত, সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়ার শপথ হোক এবারের মে দিবসের অঙ্গীকার।

 

#

২৯.০৪.২০১৯                                                                                                                                                              পিআইডি প্রবন্ধ

নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়ন

মো. আকতারুল ইসলাম

 

            ‘নিরাপদ কর্মপরিবেশ, টেকসই উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দেশে পালিত হয়েছে জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস। পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলও ২০০৩ সাল থেকে ২৮ এপ্রিল পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস পালন করে আসছে, আর বাংলাদেশ দিবসটি পালন করছে ২০১৬ সাল থেকে। পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও সেফটির বিষয়ে একটি জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে তুলতে এ দিবস পালন করছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

 

            কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও সেইফটি খুব জরুরি হলো একটি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার সকল বিভাগের সমন্নয়ে গঠিত একটি ব্যবস্থা যা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত সকলের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কল্যাণে কাজ করে থাকে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসগুলো পালিত হয় মহৎ উদ্দেশ্যে নিয়ে। ঐতিহাসিক দিবসগুলো পালিত হয় মূলত দিনটিতে জাতির ত্যাগের বিষয়টি স্মরণ করা। জাতির ইতিহাসকে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা এবং ঐ দিবসকে স্মরণ করে জাতিকে এগিয়ে নেয়া। অন্যদিকে কতগুলো দিবস জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য পালন করা হয়।  ২০৩০ সালের জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং ২০৪১ সালের উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য এ দিবসটি পালন অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং তাৎপর্যপূর্ণ।

 

         বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশ। মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে। ৪০/৪৫ লাখ লোক কাজ করে একক একটি খাতে আর তা হলো এই গার্মেন্টস। দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি এই গার্মেন্টস শিল্প বিশ্বে নিরাপদ কর্মক্ষেত্রের রোল মডেল। আজ বিশ্বের ১০টি সেরা গ্রিন ফ্যাক্টরির সাতটিই বাংলাদেশের। ২০১৩ সালের দুঃখজনক রানা প্লাজা দুর্ঘটনার আগে কারাখানার কাঠামোগত নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়টি অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। আগে তৈরিকৃত বিল্ডিং-এ গার্মেন্টস কারখানা স্থাপন করা হতো, এখন শুধু গার্মেন্টস কারখানা স্থাপনের জন্য বিল্ডিং তৈরি করা হয়। বাংলাদেশ সরকার, আইএলও, বিভিন্ন দাতাসংস্থা, ইউরোপ-আমেরিকার বায়ার সংগঠনগুলোর উদ্যোগে এবং সহযোগিতায় গার্মেন্টস কারখানাগুলো নিরাপদ কর্মক্ষেত্রের আঁধার রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে।

 

            গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে শিশুশ্রম নেই, অধিকাংশ কারখানায় ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ এর অধিকাংশ শ্রমিকের ডাটা বেইজ তৈরি হয়েছে। নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন বেতনসহ ছুটি এবং বোনাস নিশ্চিত হয়েছে। সব কারখানায় জরুরি নির্গমন সিঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পরিদর্শকগণ মোবাইল অ্যাপস লিমা’র মাধ্যমে পরিদর্শন কার্যক্রম সম্পন্ন করছে। শুধু গার্মেন্টস শ্রমিকদের যে-কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার ত্রিপক্ষীয় কমিটি গঠন করেছে। সরকার অধিকাংশ কারখানায় সেইফটি কমিটি গঠন করে দিয়েছে। কারখানা সংস্কারে বায়ারদের সংগঠন একর্ড এবং অ্যালায়েন্স চলে যাওয়ার পর কলকারখানার সংস্কার কাজ তদারকির জন্য সরকার রেমিডিয়েশন কো-অর্ডিনেশন সেল (আরসিসি) গঠন করেছে। ইতোমধ্যে আরসিসি কাজ শুরু করেছে। এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সরকার শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার শোভন কর্মপরিবেশ বা নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরকে আরো শক্তিশালী করেছে। পরিদর্শনে আরো জনবল বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। রাসায়নিক সুরক্ষা, মেশিনারি সেইফটি, নির্মাণ সেইফটি পরিদর্শন এবং আর্গোনমিক্স সম্পর্কিত গাইড প্রণয়ন করেছে।

 

            উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সুস্থ শ্রমিক। শ্রমিকরা যাতে সুস্থভাবে উৎপাদনে আত্মনিয়োগ করতে পারে সেজন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সারাদেশে ৩২টি শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের মধ্যে ৭টি নতুন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। আরো ডাক্তার নিয়োগের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। লালমনিরহাটের পাথর ভাঙা শ্রমিকদের সিলিকোসিস রোগ প্রতিরোধে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছে। কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। শ্রমিকের পেশাগত রোগের চিকিৎসা এবং পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ে গবেষণা ও প্রশিক্ষণের জন্য রাজশাহীতে ১৯ বিঘা জমির ওপর ১৬৫ কোটি টাকা ব্যয় নির্মাণ করা হচ্ছে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ইনস্টিটিউট। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে ৩০০ শয্যার বিশেষায়িত পেশাগত হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে- পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রধান কাজ হলো কর্মক্ষেত্রে যে-কোনো ধরনের ঝুঁকি বা সম্ভাব্য বিপদ প্রতিরোধ করা। জাতিসংঘের দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি অর্জন করতে হলে সকল কর্মস্থলকে নিরাপদ করতে হবে। এসডিজির ৮.৫ নম্বর লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে যুব সমাজ ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীসহ সকল নারী ও পুরুষের জন্য পূর্ণকালীন উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান ও শোভন কর্মসুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্য অর্জন এবং সমপরিমাণ সমমর্যাদার কাজের জন্য সমান মজুরি প্রদান নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে।

 

           

 

 

-২-

 

            সম্প্রতি চকবাজার এবং এফআর টাওয়ার দুর্ঘটনার পর জোর আলোচনা চলছে শুধু গার্মেন্টসই নয় স্বাভাবিকভাবেই সকল কর্মস্থলকেই নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে আনতে হবে। সকল কর্মস্থল নিরাপদ করতে হলে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পরিদর্শন ব্যবস্থাকে জোরদার করলেই মূলত সমাধান হবে না। এ জন্য রাজউক, স্থানীয় প্রশাসন, গণপূর্ত অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানকে আরো জোরদার পদক্ষেপ নিলে বিষয়টি ত্বরান্বিত হয়। ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, অগ্নি নিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তাসহ সকল প্রকার নিরাপত্তা নিশ্চিতে একসাথে নিষ্ঠার সাথে কাজ করা প্রয়োজন।

 

            পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়ে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং ব্যক্তি সচেতনতায় প্রতিটি ভবনে থাকবে জরুরি নির্গমন পথ, অগ্নি নির্বাপণযন্ত্র ব্যবহার বিধি, জরুরি ক্ষেত্রে কাঁচের জানালা বা দরজা ভাঙ্গার সুইচ, হাতুড়ি, টর্চলাইট, অগ্নিনিরোধক জ্যাকেট এবং ভবনের বাইরে থাকবে নিরাপদ সমাবেশ স্থান। থাকবে বড়ো বড়ো ইলেক্ট্রিক মই, থাকবে পাম্প করা বাম্পিং বেড, যাতে সহজেই পাম্প করে ভবনের নিচে পেতে রাখলে তার ওপর জরুরি মুহুর্তে নির্ভয়ে লাফ দিয়ে মানুষ বাঁচতে পারবে।

 

            সরকারের একার পক্ষে এসব বিষয় সুচারুরূপে নিশ্চিত করা কঠিন। দায়িত্বশীল সকল সংস্থা, ভবন এবং কারখানা মালিক, শ্রমিক সবাই পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়টিতে আরো সচেতন হোন, তাহলে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অনেক কমে আসবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী শতভাগ শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হবে। টেকসই হবে উন্নয়ন, টেকসই হবে দেশের অর্থনীতি। সহজ হবে ২০৪১ সালের উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন।

 

#

২৯.০৪.২০১৯                                                                                                                                                              পিআইডি প্রবন্ধ

 

 

‘মিথ্যে’ আর নয়

নাসরীন মুস্তাফা

 

            ভাংতি হবে? রিক্সাভাড়া দিতে পারছিলেন না তিনি। রিক্সাওয়ালাও বাকি টাকাটা ভাংতি করে ফেরত দিতে পারছেন না। অফিসের সামনে এই সময় প্রচুর ভিড় থাকে, দাঁড়ানোর ফুরসত নেই কারোর। অগত্যা রিক্সা থেকে নেমে পড়লেন তিনি। দু’ কদম হেঁটে দেখলেন পাশের ফুটপাতের ওপর ঘুমন্ত সন্তান কোলে নিয়ে ভিক্ষা করছে এক নারী। ভাংতি চাইলে কোনো কথা না বলে টাকাটা ভাংতি করে দিল। রিক্সাওয়ালার ভাড়া পরিশোধ করা হলো। ভিক্ষুক মহিলাকে কিছু টাকা দিয়ে খুব খুশি তিনি। ইহকালের জন্য দারুণ একটা কাজ করে ফেলেন দিনের শুরুতেই।

 

            ব্যক্তিগত পর্যায়ে পুণ্য অর্জনের ইচ্ছেকে পুঁজি করে ভিক্ষাকে ব্যবসা হিসেবে দাঁড় করিয়ে ফেলেছে শক্তিশালী একটি চক্র। এদের বিস্তৃত ফাঁদে পা দিয়ে ভিক্ষুক হতে বাধ্য হচ্ছে দুর্বল চিত্তের নারী-পুরুষ। হারাচ্ছে সম্মান, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পর্যন্ত। শিশুদের কথা বলি বিশেষভাবে। মানুষের সহানুভূতি বেশি বেশি পাওয়ার আশায় নারী ভিক্ষুকের কোলে শিশু রাখাটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এই শিশুদের বেশির ভাগই কোলে উঠে কোল থেকে নেমে যেতে চায়। আশ্চর্যজনকভাবে এরা অতি শান্তভাবে কোলেই থাকে, বলা যায় ঘুমিয়েই থাকে। শিশু কেন চাঞ্চল্য হারিয়ে কেবল ঘুমিয়ে থাকে ভিক্ষুক নারীর কোলে? এ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। ভিক্ষাচক্রে জড়িয়ে পড়া সন্ত্রাসী আর নিষ্ঠুর মানুষগুলো শিশুদেরকে মাদকের নেশায় ঘুম পাড়িয়ে দেয়, এ কথা আমরা জানি। গরিব মা-বাবা সামান্য কিছু টাকার লোভে সন্তানকে ভিক্ষুক নারীর কাছে ভাড়া দেন দিন হিসেবে। সন্তানটি যে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই? সামাজিক এই বাস্তবতার জবাবে কেউ হয়তো বলবেন, ওরা আর কী করবে? পেটে খিদে থাকলে মানুষ কী না করে!

 

            কথাটা ঠিক। পেটে খিদে থাকলে মানুষ অনেক কিছুই করে। দুই পা নেই, তবুও ফুটপাতে পত্রিকা সাজিয়ে বসে থাকা তরুণ রহমত কিন্তু পেটের জ্বালাতেই কাজ করছে। দুই হাত নেই, দুই পা নেই, মুখে কলম নিয়ে পরীক্ষায় ব্যস্ত ছোট্ট শিশুর ছবি দেখেছিলাম কয়েক দিন আগে। লেখাপড়া শেখার অদম্য আগ্রহ ওর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে মায়ের কোলে চড়ে গিয়েছিল অচল পায়ের হৃদয়। মানুষ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর এই মুখগুলোতে হাত-পা না থাকলেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা পবিত্র আলোয় ঝলমল করে ওঠে। বড়ো হতে চায়, পরিবারের দুঃখ ঘোচাতে চায় শারীরিকভাবে অচল মানুষরাও। এই চাওয়াটাই স্বাভাবিক। দারিদ্র্য প্রথমে বাসা বাঁধে মনে। কারোর মনের ভেতর যদি হাত পাতার অভ্যাস গেঁথে যায়, সে মিথ্যে দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারবে না। 

 

            একজন মন্ত্রী একবার বলেছিলেন, ‘দেশে কোনো ভিক্ষুক নেই। শহরের রাস্তাঘাটে কিছু ভিক্ষুক দেখতে পাবেন। এরা স্বভাবগতভাবে ভিক্ষুক। এদের রাজবাড়ি বানিয়ে দিলেও ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়বে না। তাদের পেশাই হলো ভিক্ষাবৃত্তি।’ কথাটা কী পুরোপুরি মিথ্যা। ছয় তলা ভবনের মালিকও ভিক্ষা করে বলে মাঝে মাঝে গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

 

            ব্যক্তিগতভাবে এই সমাজের একজন সচেতন সদস্য হিসেবে স্বভাবগত ভিক্ষুকদেরকে নিরুৎসাহিত করা আমার আপনার আমাদের কাজ। ভিক্ষার হাতকে কাজের হাতে পরিণত করার উপায় কী? হাত পাতার পরও যদি আমি আপনি আমরা কখনোই ভিক্ষার সামান্য কড়ি না দিতাম, তবে কী হতো? ভিক্ষাবৃত্তি নিরুৎসাহিত হতো। ভিক্ষুকের আশপাশে পাহারায় থাকা সন্ত্রাসীচক্র নিরুৎসাহিত হতো। ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ হলে বেঁচে যেত অসহায় নারী ও পুরুষ। চোখ হারাতে হতো না। হাত-পা ভেঙে পথে পড়ে থাকতে হতো না। আর শিশুদেরকেও ঘুমিয়ে থাকতে হতো না মিথ্যে মায়ের কোলে।

 

            রাষ্ট্রীয়ভাবে কী কিছুই হচ্ছে না ভিক্ষাবৃত্তিকে বন্ধ করার জন্য? ‘ভিক্ষার থালা পেতে নয়, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই'- বর্তমান সরকারের এই স্পষ্ট ঘোষণা বার বার উচ্চারিত হচ্ছে, যা আশার আলো দেখায়। ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন, ভিক্ষুক ও ছিন্নমূল মানুষদের সরকারের তরফ থেকে বিনা খরচে পুনর্বাসন করা হবে। যদিও ২০১০ সাল থেকেই সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ শীর্ষক কর্মসূচি পরিচালনা করছিল। কেননা, ঐ বছরে 'শিশুর অঙ্গহানি করে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করা' শিরোনামে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর উচ্চ আদালতে ভিক্ষাবৃত্তির বিরুদ্ধে রিট করা হয়। এর প্রেক্ষিতে রাজধানীসহ দেশের সব স্থানে শিশু ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

 

            ‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ কর্মসূচির আওতায় ঢাকা শহরে ১০টি বেসরকারি সংগঠনের সহায়তায় ভিক্ষুক জরিপে ১০ হাজার ভিক্ষুকের ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করে ডাটাবেজ তৈরি করা হয়। এদের মধ্যে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু ভিক্ষুকের সংখ্যা ছিল ১০ শতাংশ। ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদেরকে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

 

 

 

 

 

 

 

-২-

 

            প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পসহ অন্যরাও কর্মসূচি হাতে নিতে থাকে। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ‘যার জমি আছে ঘর নাই তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ’ উপখাতের আওতায় ভিক্ষুকরা ঘর পাচ্ছে, পুনর্বাসিত হচ্ছে। তবে কথা আছে, চরিত্রগত ভিক্ষুকদের অনেকের ক্ষেত্রেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েও সফল হওয়া যায়নি। কোনো কোনো জেলার পুনর্বাসিত ভিক্ষুকদের বেশির ভাগই রিকশা, ভ্যান বিক্রি করে পুনরায় ঢাকায় চলে এসেছে। আবার কোনো কোনো জেলায় পুনর্বাসনকৃত স্থানীয় ভিক্ষুকগণ রিকশা, ভ্যান ও সরবরাহকৃত পুজিঁ ব্যবহারের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছে। সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ঢাকা শহরের কিছু এলাকাকে ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে ভিক্ষুকমুক্ত এলাকার আওতা আরও বৃদ্ধি করা হবে বলে চেষ্টা অব্যাহত আছে। ভিক্ষুকমুক্ত হিসেবে ঘোষিত এলাকাসমূহে ভিক্ষাবৃত্তি না করার জন্য ২/১ দিন পর পর নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে, নির্দিষ্ট সময় অন্তর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা, এর মাধ্যমে প্রাপ্ত ভিক্ষুকদেরকে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানোর চেষ্টাও কিন্তু আছে। প্রতিষ্ঠানে থাকাকালীন তাদেরকে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ এবং পুনর্বাসন করা হয়।

 

            ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে ভিক্ষুককে পুনর্বাসিত করার উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করা নিষ্ঠুর চক্রটিকে আইনের আওতায় আনার পদক্ষেপও দরকার। নইলে ভিক্ষকমুক্ত সমাজ গঠনের মধ্য দিয়ে রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। চক্রটিকে হতোদ্যম করার জন্য ব্যক্তি পর্যায়ে আমার আপনার আমাদের ভিক্ষা প্রদানে নিরুৎসাহিত হওয়াটাও কিন্তু খুব জরুরি। সাহায্য এমন হতে হবে, যাতে সাহায্যপ্রার্থীকে আর সাহায্য চাইতে না হয়- এই নিয়ম যাকাতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। পুণ্য অর্জনের জন্য সেভাবেই সাহায্য দিতে হবে, যাতে সাহায্য যাকে দেওয়া হলো, তিনি নিজেই পরবর্তীতে অন্যকে সাহায্য করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন। খুচরা পাঁচ-দশ টাকা বা ভাংতি করা টাকা থেকে কিছু অংশ দিয়ে তো আর সেই নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয় না। ‘মিথ্যে’ দানসদকা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসাটা জরুরি।

 

#

১২.০৩.২০১৯                                                                                                                                                              পিআইডি প্রবন্ধ

 

 

শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধীর জন্য চাই ইশারা ভাষার প্রসার

মুহাম্মদ ফয়সুল আলম

 

          দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি সাধনা গড়ে ওঠে মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে। মানুষের সবরকম অনুভূতি ও কল্পনা, ভাব ও আদর্শ, মনের আকুতি ও আত্মার ব্যাকুলতা প্রেরণা পায় ও রূপান্তরিত হয়ে ওঠে মাতৃভাষার মাধ্যমে। ইশারা ভাষার স্বীকৃতি, প্রসার ও পৃষ্ঠপোষকতা এবং এই ভাষাগোষ্ঠীর স্বকীয় সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি দেওয়ার পাশপাশি খোদ মূক ও বধির জনগোষ্ঠী নিয়ে ভাবতে হবে।

 

            সিরাজ আহমেদ, ফরিদা বেগম ও তাদের মেয়ে বিছানায় বসে গল্প করছেন। কিন্তু টুকটাক আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। কেননা, তারা ইশারা ভাষায় কথা বলছেন। সিরাজ আর তার স্ত্রী ফরিদা বেগম কানে শোনে না এবং কথা বলতে পারে না। তবে ছেলেমেয়েরা কথা বলতে পারে। মা-বাবার সঙ্গে এই দুই-ভাইবোনের সব যোগাযোগ হয় ইশারা ভাষায়।

 

            শুধু এই দম্পতি নন, দেশের প্রায় ৩০ লাখ শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও পরিবারের সদস্যদের সমস্যা এটি। শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী (বধির) সমাজের বোঝা নয়। এরা সাধারণের মতোই নিজেদের মেধা-দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে উন্নত জীবন ও সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। এক কথায় বধির, জনগোষ্ঠী সমাজ ও রাষ্ট্রের মানবসম্পদই বটে। কোনোভাবেই এই প্রতিবন্ধীদের অবহেলা না করে সহায়ক সেবা দিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানো সম্ভব।

 

            এই শ্রেণির প্রতিবন্ধী নিজেরা কেউ মুখ ফুটে কথা বলতে না পারলেও সমাজের সুস্থ মানুষগুলোর সঙ্গে মনের ভাব প্রকাশ করেন ইশারা ভাষায় এবং প্রতীকী নির্দেশনার মাধ্যমে। ইশারা ভাষা বলতে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিশেষ করে হাত, ঠোঁট, চোখ ইত্যাদি নাড়ানোর মাধ্যমে যোগাযোগ করার পদ্ধতিকে বুঝানো হয়। মুখের ভাষাতে যোগাযোগ করা অসম্ভব হলে এই ভাষা ব্যবহার করা হয়।

 

            উন্নতবিশ্বে প্রশিক্ষণ ও আক্ষরিক শিক্ষার মাধ্যমে মূক ও বধির জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে পরিণত করা হয়েছে। আমাদের দেশে এখনো তারা সামাজিক অনাদর ও অবহেলার গণ্ডির মধ্যে রয়ে গেছে। দেশের এই জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সরকারের পাশপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও কার্য©করী ভূমিকা রাখতে পারে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের প্রত্যেকেরই রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। তাদের মধ্যে অনেক দক্ষ পরিশ্রমী ও প্রখর মেধার অধিকারীও আছে। তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায়ও এগিয়ে রয়েছে। আমাদের মতো দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের প্রায় সবার হাতে হাতে দেখা যায় স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহ- ফেসবুক, ইমু, হোয়াটসঅ্যাপ এর মতো জনপ্রিয় মাধ্যমগুলো তারা ব্যবহার করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান করে থাকে।

 

            আক্ষরিক জ্ঞানসম্পন্ন মূক ও বধিররা আমাদের মতোই সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন। সবই তারা বুঝে, দেখে, উপলব্ধি করে। কিন্তু তারা শোনে না, মুখ ফুটে কথা বলতে পারে না। সচেতনতার অভাবে এই শ্রেণির মানুষগুলো এখনো নানাভাবে অবহেলিত-বঞ্চিত হয়ে আছে। তাদের সংখ্যা নিতান্তই কম নয়। তাই তাদের জন্য আমাদের প্রত্যেকেরই এগিয়ে আসা উচিত। জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৮ দশমিক ৫ শ্রবণ প্রতিবন্ধী ও ৩ দশমিক ৯ হচ্ছে বাক প্রতিবন্ধী। ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব দ্য ডেফের তথ্য মতে, সারাবিশ্বে প্রায় সাত কোটি শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী রয়েছে। আমাদের দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৯৭ জন নিবন্ধিত বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী আছে। এর মধ্যে ১ লাখ ১৮ হাজার ৯০৭ জন বাকপ্রতিবন্ধী ও ৪৭ হাজার ৪৯০ জন শ্রবণ প্রতিবন্ধী আছে।

 

            মানবসভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভাষা; সেজন্য ইশারা ভাষার এ সংকট উত্তরণে এখনই সময় বাংলা ইশারা ভাষা ইনস্টিটিউট স্থাপন; যে ইনস্টিটিউট ইশারা ভাষার প্রসার, আইনি স্বীকৃতি আদায় ও ভাষার প্রমিতকরণে গ্রহণ করবে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

 

            সরকার অসহায় পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোকে সামনে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। সরকার প্রতিবন্ধীদের জন্য খুবই আন্তরিক বলেই প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে নানা প্রকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত করছে। শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী মানুষের ভাব প্রকাশে ইশারা ভাষার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সাংস্কৃতিক বিকাশ মানেই বাংলা ইশারা ভাষার বিকাশ। সরকার এরই মধ্যে জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী অধিকার সনদ অনুসমর্থন করেছে।

 

            এ সনদ ইশারা ভাষার স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়। শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী মানুষ এ ভাষার মাধ্যমে তাদের মনের ভাব প্রকাশ করে। সরকার বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের জন্য বাংলা ইশারা ভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়াও সরকার বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের জন্য সফটওয়্যার বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য সফটওয়্যার বা ডিজিটাল ইশারা ভাষাও বলা যেতে পারে। এটি মূলত সাইট টু স্পিচ সফটওয়্যার। এর মাধ্যমে কোনো কম্পিউটার বা মোবাইলের ক্যামেরার সামনে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বা ইশারা ভাষায় কথা বললে সেটি স্পিচ বা কথা হিসেবে অনুবাদ হয়ে বলে দেবে। এটি এমনকি ইউনিকোড টেক্সটেও রূপান্তর হবে। এই সফটওয়্যার নির্দিষ্ট কোনো ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল হবে না। সাধারণ অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল বা সমপর্যায়ের ডিভাইসেই তা কাজ করবে।

 

-২-

 

            ইশারা ভাষা নির্ণয়ে মোশন ইমেজ প্রসেসিং পদ্ধতির সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশেষ করে মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে এই সফটওয়্যারে। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি তার দৈনন্দিন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজে যতগুলো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে থাকেন এর প্রায় সবগুলোই এই সফটওয়্যারের আওতাভুক্ত থাকবে। যেমন- চিকিৎসাসেবা গ্রহণ ও রোগের বর্ণনা, পুলিশের কাছে আইনি সহায়তা ও পরিস্থিতি বর্ণনা ক্লাসরুম, রেস্তোরা ইত্যাদি।

 

            প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে ইশারা ভাষায় সংবাদ উপস্থাপনের উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানান। বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও দেশ টিভি চ্যানেলগুলো ইশারা ভাষায় খবর উপস্থাপন করছে।

 

            দেশব্যাপী ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্যকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে যা থেকে বছরে প্রায় ৪ লক্ষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সরাসরি সেবা পাচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে ৩২টি মোবাইল থেরাপি ভ্যানের মাধ্যমে।

 

            সকল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে বেশকিছু আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। “প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩” এবং “নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩” আইন দুটি অন্যতম। এই আইন দু’টির মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার এখন আইন দ্বারা স্বীকৃত হলো। দশম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশনের শেষ আইন “বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন ২০১৮” পাস করা হয়েছে। এই আইনটির ফলে দেশের বিদ্যমান প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কিংবা দুর্ঘটনার ফলে পঙ্গুত্ববরণকারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি পুনর্বাসন প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে।

 

            প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজেরই অংশ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সকল শ্রেণির শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধীদের জন্য সেবা ও সহায়ক সামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তাদেরকে বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা গৃহীত হলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন হবে না। অর্জিত হবে না টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মুল টার্গেট অর্থাৎ কেউ উন্নয়নের বাইরে নয়। এই বাস্তবতাকে সুবিবেচনা করে বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধিতা ইস্যুটিকে অগ্রাধিকার খাত বিবেচনা করে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে করে দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা উপকৃত হচ্ছে। পাশাপাশি সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রতিবছর প্রতিবন্ধীদের জন্য চাকুরির মেলা আয়োজন করছে। এতে করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে কর্মচঞ্চলতা ফিরে এসেছে। সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়তে হলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করে সকলে মিলে কাজ করতে হবে।

 

#

 

০৩.০৪.২০১৯                                                                                                                        পিআইডি প্রবন্ধ

 

 

অটিস্টিক ব্যক্তির কল্যাণে প্রয়োজন সঠিক পরিচর্যা

মোঃ মাইদুল ইসলাম প্রধান

 

        ২ এপ্রিল ১২তম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস ২০১৯। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘সহায়ক প্রযুক্তির ব্যবহার, অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির অধিকার’ যা অত্যন্ত সময়োপযোগী। বর্তমান যুগ প্রযুক্তিনির্ভর। প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন সুদৃঢ় অবস্থানে। বাংলাদেশে বর্তমানে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাওয়ার পাশাপাশি প্রায় প্রতিঘরেই ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে গেছে। দেশের অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদেরও ডিজিটাল সেবার প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিবছর সারাবিশ্বে ২ এপ্রিল অটিজম সচেতনতা দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও প্রতিবছর এ দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয়। এ উপলক্ষে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, সামাজিক সংগঠনসমূহ বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অটিস্টিকদের প্রতি জনগণের সহযোগী মনোভাব তৈরি করতে হবে এবং তাদের যাতে সঠিক পরিচর্যা হয় সে বিষয়ে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

 

            এক দশকে বাংলাদেশে অটিজম বিষয়ে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। ১৪টি মন্ত্রণালয়কে নিয়ে গঠিত হয়েছে জাতীয় টাস্কফোর্স। ৮টি মন্ত্রণালয়/বিভাগ-এর সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি। এর মধ্যে প্রথম সারির ৫টি হলো সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। বেসরকারি পর্যায়েও অনেক প্রতিষ্ঠান অটিজম ও নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কাজ করতে উৎসাহী হয়েছে। অটিজম ও নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপার্সন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন কখনও সরাসরি, কখনও ভিডিও কনফারেন্স এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

 

            অটিজম কোনো রোগ নয়, এটি শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশজনিত একটি সমস্যা। শিশুর সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধা সৃষ্টি করে। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুর চেহারা সুন্দর হয়, কিন্তু মা-বাবা বা আপনজনের ডাকে সাড়া না দিয়ে নীরব থাকে। শিশুর এ নীরবতাই মায়ের মনোবেদনার কারণ। এ ধরনের শিশুকে নিয়ে মা নিদারুণ অসহায় হয়ে জীবন কাটিয়ে দেন। এ ধরনের শিশুর জন্মের জন্য মাতাপিতাকে দায়ী করা যায় না। কী কারণে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুর জন্ম হয় বিজ্ঞানীরা তা নির্ণয় করতে আজও সক্ষম হয়নি।

 

            অটিজম বিষয়ে সাধারণ মানুষদের সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ২০০৯ হতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণে অটিস্টিক জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি তাদের পিতামাতা ও অভিভাবককেও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। এ যাবৎ অনুষ্ঠিত উল্লেখযোগ্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মধ্যে অটিস্টিক শিশুর ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণে ১৫টি ব্যাচে ৪৭২ জন মাতাপিতাকে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে। এ সকল প্রশিক্ষণ পরিচালনায় অটিজম বিষয়ে দক্ষ সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, চিকিৎসক, এনজিও প্রধানসহ ভিন্ন ভিন্ন পেশায় দক্ষ প্রশিক্ষকবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। স্নায়ুবিকাশের ভিন্নতাজনিত সীমাবদ্ধ পরিস্থিতিতে মানুষ যথাযথভাবে সামাজিক যোগাযোগ সংরক্ষণ, চলাফেরা, ভাববিনিময় এবং দৈনন্দিন কাh©নির্বাহে পরিপূর্ণ অংশগ্রহণে সমর্থ হয় না। স্নায়ুবিকাশের ভিন্নতার প্রধান ধরনগুলো হলো- অটিজম, ডাউনসিনড্রোম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা ও সেরিব্রাল পালসি।

 

            রাজধানীতে অটিজম সংক্রান্ত অনেকগুলো চিকিৎসা সহায়তাকেন্দ্র রয়েছে। যেমন- ইন্সটিটিউট ফর পেডিয়াট্রিক নিউরো-ডিসঅর্ডার এন্ড অটিজম (IPNA), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট, চাইল্ড গাইডেন্স ক্লিনিক, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, শিশু বিকাশ কেন্দ্র, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, প্রয়াস বিশেষায়িত স্কুল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এর শিশুরোগ/মনোরোগবিদ্যা বিভাগ। তাছাড়া সারাদেশে জেলা সদর হাসপাতাল/ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স; সরকার অনুমোদিত বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও বিশেষায়িত স্কুল, প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র এবং জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন হতে এ সংক্রান্ত সেবা পাওয়া যাবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সারাদেশে ১০৩টি সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।

 

            প্রতিবন্ধী কল্যাণ ট্রাস্টের আওতায় টঙ্গীস্থ ইআরসিপিএইচ কেন্দ্রে একটি মিনারেল/ড্রিংকিং ওয়াটার প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। অত্যাধুনিক মেশিন রিভার্স অসমোসিস পদ্ধতিতে দৈনিক ৫০০ লিটার উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এ প্লান্টের মাধ্যমে বোতলজাতকৃত পানি মুক্তা মিনারেল/ড্রিংকিং ওয়াটার নামে বাজারজাত করা হচ্ছে। এ প্লান্টের আয় শুধু প্রতিবন্ধীদের কল্যাণার্থে ব্যয় করা হয়।

 

            টঙ্গীস্থ ইআরসিপিএইচ কেন্দ্রে প্রতিবন্ধী কল্যাণ ট্রাস্টের আওতায় স্থাপিত মৈত্রী শিল্প কেন্দ্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্লাস্টিকসামগ্রী যেমন: বালতি, জগ, মগ, বদনা, গ্লাস, হ্যাঙ্গার উৎপাদন করা হয়।

 

 

-২-

 

            মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ঢাকাস্থ মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের নিজস্ব ক্যাম্পাসে ২০১০ সালে যাত্রা শুরু হয় অটিজম রিসোর্স সেন্টারের। একটি সুদক্ষ ও অভিজ্ঞ মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিমের সমন্বয়ে অটিজম রিসোর্স সেন্টারটি পরিচালিত হচ্ছে।

 

            বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে ও দেশে অটিজম দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরতে দেশের সকল সরকারি,
বেসরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহে তিনদিনব্যাপী নীলবাতি প্রাজ্বলন করা হয়।

 

            অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুর/ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্রীয় পর্যায় হতে নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে সরকারের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। যেমন- অটিজম, ডাউন সিনড্রোম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা ও সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষায় ২০১৩ সালে নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন-২০১৩ প্রণয়ন; প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ প্রণয়ন; এবছর ১০ম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশনের শেষ আইন বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন-২০১৮” পাস করা হয়েছে। এই আইনটির ফলে দেশের বিদ্যমান প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কিংবা দুর্ঘটনার ফলে পঙ্গুত্ববরণকারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি পুনর্বাসন প্রক্রিয়া  গ্রহণ করা হবে। এছাড়াও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার বিষয়ক কর্মপরিকল্পনা ২০১৯ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

 

            সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি যেমন- অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা, প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি এবং প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রসহ অন্যান্য অনেক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এ অব্যাহত প্রচেষ্টা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মানসিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ জীবন গঠনের পথকে আরো প্রসারিত করবে।

 

            সরকারের পাশাপাশি সূচনা ফাউন্ডেশন, প্রয়াস, সোয়াক, সিডিডি, পিএফডিএ, স্কুল ফর গিফটেড চিলড্রেন, সোসাইটি ফর দ্যা ওয়েলফেয়ার অব দ্যা ইন্টেলেকচুয়ালি ডিজএ্যাবল (সুইড) বাংলাদেশ, সীড ট্রাস্ট, অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, বিউটিফুল মাইন্ড, নিষ্পাপ অটিজম ফাউন্ডেশন, এফএআরইসহ আরও অনেক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উন্নয়ন অংশীদার, সমাজ হিতৈষী ব্যক্তি, অটিজম ও নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজিএবলিটিস বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুদের বিকাশে আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

            সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে আন্তরিকভাবে অটিস্টিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির কল্যাণে অংশগ্রহণ করা হলে বাংলাদেশের সাংবিধানিক অঙ্গীকার এবং জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভিলক্ষ্যের ভিত্তিতে সকলের জন্য সমঅধিকার, ন্যায়পরায়ণতা ও সুন্দর কর্মস্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ অচিরেই উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হওয়ার গৌরব অর্জনে সক্ষম হবে। অটিস্টিক শিশুদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও সহায়ক সামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিতকরণসহ তাদের অধিকার ও উন্নয়নে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। অটিস্টিক শিশু-কিশোরদের সম্ভাবনাগুলোকে চিহ্নিত করে সঠিক পরিচর্যা, শিক্ষা ও স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তোলা হলে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বোঝা না হয়ে অপার সম্ভাবনা বয়ে আনবে।

 

#

 

০৩.০৪.২০১৯                                                                                                                        পিআইডি প্রবন্ধ

 

 

 

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব ও রূপকল্প ২০২১

সফিউল আযম

 

            সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব ব্যবস্থা। এতে জনগণকে সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত বিনিয়োগ করে থাকে। সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতের চুক্তি হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড়োবড়ো স্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন বা নির্মাণ এ পদ্ধতিতে হয়েছে।

 

            বর্তমান সরকারের ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেটে প্রথম সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) নামের মডেল ঘোষণা করা হয়। প্রথমবার বরাদ্দ দেওয়া হয় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এরপর থেকে প্রতি বাজেটেই পিপিপিতে বরাদ্দ বাড়তে থাকে। বর্তমানে এই প্রাইভেট বা পাবলিক পার্টনারশিপ-পিপিপি'র মাধ্যমে অবকাঠামো খাতে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে। বাংলাদেশে যে এমডিজি অর্জিত হয়েছে, তার পেছনে সরকার এবং সরকার বর্হিভূত ‘অ্যাক্টর'-দের একটা বড়ো ভূমিকা ছিল। এসডিজি অর্জনেও কিন্তু একটা বড়ো ধরনের পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। একথা অনস্বীকার্য যে, এসডিজির ১৬৯টা লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন সরকারের একার পক্ষে করা কঠিন, পার্টনারশিপ লাগবে।

 

            সরকারি তহবিলের ওপর চাপ কমাতে বর্তমান সরকার বিকল্প অর্থায়নে বাজেটে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) প্রকল্পে বিশেষ জোর দিয়েছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে উন্নয়ন প্রকল্পের অন্তত ত্রিশ ভাগ পিপিপিতে নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার হিসাব মতে, সরকারের রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১-এর অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে দেশের ভৌত অবকাঠামো ও সেবাখাতে প্রতিবছর বিনিয়োগ প্রয়োজন মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশর সমান অর্থ। অর্থাৎ প্রতিবছর কমপক্ষে ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। যেখানে পিপিপির মাধ্যমে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে জিডিপির ১ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিবছর পিপিপি প্রকল্পে বিনিয়োগ হতে হবে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার, যা অবকাঠামো ও সেবাখাতের মোট বিনিয়োগের ৩০ শতাংশ। এজন্য প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে প্রকল্পে মোট বিনিয়োগের ৩০ শতাংশ পিপিপি’র মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। এতে একদিকে সরকারি অর্থ সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কাজে আসবে। পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করতে পিপিপি আইন, প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন এবং পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতিমালা ২০১৭ প্রণীত হয়েছে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে।

 

            এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের পানি, বিমানবন্দর, মহাসড়ক, মেট্রোরেল, শিক্ষা, হাসপাতাল এবং আবাসনখাতে পিপিপি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ দ্রুত ৮ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে। পিপিপি উদ্যোগে অনেক দেশেই কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়েছে। দিন দিন এ উদ্যোগে সফল দেশের সংখ্যা বাড়ছে। তবে যে দেশগুলো সফল হয়েছে তারা যুগোপযোগী পিপিপি মডেল গ্রহণের মাধ্যমে সেই সাফল্য পেয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত কাঠামোর ভিত্তিতেই তারা ওই মডেল গ্রহণ করেছে।

 

            অবকাঠামো উন্নয়নে গতিশীল হচ্ছে পিপিপি। এর আওতায় ৪৫টি প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ‘নব উদ্যোগ বিনিয়োগ প্রয়াস’ নামে সরকারের এই প্রকল্পে সড়ক, আইসিটি, গৃহায়ণ, নৌ-পরিবহণ, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, রেলপথ, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পর্যটন উন্নয়নসহ মোট ৯টি খাত চিহ্নিত করেছে সরকার। এসব খাতে বিদেশিদের পাশাপাশি দেশীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছে। পিপিপিতে আগ্রহ দেখিয়ে বিনিয়োগ করেছে ওরিয়ন গ্রুপ, ট্রপিক্যাল হোমস ও পাওয়ার প্যাকসহ আর বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে চীন, জাপান, কানাডা, থাইল্যান্ড, ভারত এবং কোরিয়ার মতো দেশের উদ্যোক্তারা পিপিপিতে বিনিয়োগ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

 

            বিনিয়োগকারীরা যাতে এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করে লভ্যাংশ পেতে পারেন, সেজন্য বিশেষ কিছু সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে পিপিপি প্রকল্পে কারিগরি সহায়তার বিপরীতে অর্থায়ন, আর্থিক সামর্থ্য ঘাটতির বিপরীতে অর্থায়ন, প্রকল্প কোম্পানিতে ইক্যুইটি ক্রয় বা ঋণের বিপরীতে অর্থায়ন সুবিধা প্রদান, পিপিপি প্রকল্পের সঙ্গে সংযুক্ত কম্পোনেন্ট বাস্তবায়নের বিপরীতে অর্থায়ন, পিপিপি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো কর্মকাণ্ডের বিপরীতে অর্থায়ন এবং মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতি প্রদান প্রভৃতি।

 

            দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের অভিপ্রায়ে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার জন্য পিপিপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ও প্রতি বাজেটে বরাদ্দের ধারাবাহিকতা থাকলে পিপিপি গতিশীলতা পাবে। পিপিপিতে নেয়া ৪৫ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে রূপকল্প ২১ বাস্তবায়নের পাশাপাশি উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্নপূরণ করা সম্ভব।

 

 

 

 

-২-

 

            উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বকে (পিপিপি) আরো শক্তিশালী করা দরকার। পিপিপি’র সফলতা নির্ভর করছে এর সফল অর্থায়নের ওপর। এক্ষেত্রে বিদেশি অর্থায়ন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে পারে। সরকার সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একত্রিত করে একটি উইন-উইন (win-win) পরিস্থিতি তৈরি করতে পিপিপি করেছে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগের জন্য স্বচ্ছতা, পর্যবেক্ষণ ও সুশাসন দরকার। পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর মানসিকতার পরিবর্তন এ খাতে বিনিয়োগে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করবে। তাই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

 

            আমাদের দেশে সবচেয়ে কমখরচ হয় পানি ও বিদ্যুতে, যা এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশে রয়েছে একটি বিশাল শ্রমবাজার। এখানে রয়েছে প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ, উর্বরভূমি ও পর্যাপ্ত ফসলি জমি। যেখানে বিনিয়োগের একটি বিশাল সম্ভাবনার খাত রয়েছে। একথা অনস্বীকার্য যে, বর্তমান সরকার বিনিয়োগবান্ধব। বিনিয়োগকারীদের জন্য রয়েছে ওয়ানস্টপ সুবিধা। শিল্প সহায়ক পরিবেশ রয়েছে ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে। এছাড়াও বর্তমান সরকার বাংলাদেশ ২১০০ সালে ডেলটা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে আমাদের দেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার স্বপ্ন অভিযাত্রার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাই বিনিয়োগের জন্য অবধারিতভাবে বাংলাদেশই হচ্ছে সর্বোত্তম স্থান।

 

#

 

০৩.০৪.২০১৯                                                                                                                        পিআইডি প্রবন্ধ

 

 

 

ভোক্তা অধিকার আইন এবং নিরাপদ মানসম্পন্ন পণ্য

ম. জাভেদ ইকবাল

 

            বাজার অর্থনীতির যুগে নিরাপদ, গুণগত মানসম্পন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য ও সেবা পাওয়া প্রত্যেক ভোক্তার অধিকার। ভোক্তা অধিকার বর্তমান সময়ে একটি আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সময়ে ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন দেশ আইনও পাস করে। বাংলাদেশেও ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।

 

            বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল ও ক্রমবিকাশমান বাজার ব্যবস্থাপনার দেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও ভোক্তা অধিকার বিরোধী কাজগুলো প্রতিরোধ করা একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। বেসরকারি সংস্থা ক্যাব (কনজুমারস এসোসিয়েশান অব বাংলাদেশ) ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশকে নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছিল। অবশেষে নবম জাতীয় সংসদে ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ প্রণয়ন করা হয় এবং ২০১০ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

            ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ গঠিত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এই পরিষদের চেয়ারম্যান হলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। আইনটি বাস্তবায়নে জনসচেনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, উপজেলা, ইউনিয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইনটি বাস্তবায়নে সরকারের দুটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি কাজ করে যাচ্ছে। একটি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, অন্যটি জেলা প্রশাসন। অন্যান্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন পুলিশ, র‌্যাব, এপিবিএন, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ, ক্যাব প্রভৃতি সহায়তা করে থাকে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বর্তমানে দুটি পদ্ধতিতে কাজ করে। সরাসরি বাজার মনিটরিং, আর অন্যটি হলো ভোক্তার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে শুনানির মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তি।

 

         ভোক্তা অধিকার আইন ২০০৯ অনুসারে একজন ভোক্তা পণ্য ক্রয় করে যদি ওজনে কম, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল পণ্য, বাটখারায় কম ওজন, নকল পণ্য, মিথ্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণা, অতিরিক্ত দাম নেওয়া, অবৈধ উপায়ে পণ্য উৎপাদন, পণ্যের মোড়কে বিস্তারিত বিবরণ না লেখা থাকে- এগুলোর শিকার হন তাহলে ভোক্তা হিসেবে তিনি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অথবা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে উপযুক্ত প্রমাণসহ (দ্রব্য ক্রয়ের রসিদ কিংবা উপযুক্ত দলিল) লিখিত অভিযোগ করতে পারবেন। এই আইনের অন্যতম একটি দিক হলো, যদি বিক্রেতা দোষী প্রমাণিত হয় তবে বিক্রেতার ওপর জরিমানাকৃত অর্থের শতকরা ২৫ ভাগ ভোক্তাকে প্রদান করা হবে। অর্থাৎ আইনটি অত্যন্ত জনবান্ধব। এই আইনের মাধ্যমে জনগণকে অনেকখানি ক্ষমতায়িত করা হয়েছে।

 

            ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করা একটি ত্রিপাক্ষিক বিষয় যার সাথে জড়িত রয়েছে উৎপাদনকারী, বিক্রেতা এবং ভোক্তা বা ক্রেতা। শুধু জেল জরিমানা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এজন্য ভোক্তা তথা সাধারণ জনগণকে যেমন সচেতন হতে হবে একইভাবে উৎপাদকারী ও বিক্রেতাকেও সচেতন হতে হবে। কারণ আমরা সকলেই ভোক্তা। উৎপাদনকারী বা বিক্রেতা এবং ভোক্তার সমন্বিত আন্তরিক প্রচেষ্টাই ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। এ কারণে বাজার মনিটরিং-এর পাশাপাশি সাধারণ জনগণ তথা ভোক্তা এবং উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীদের সচেতন করার বিষয়টিকে বর্তমানে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আর এ উদ্দেশ্যে শহর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের হাটবাজার পর্যন্ত পোস্টার, প্যাম্ফলেট, লিফলেট, স্টিকার বিতরণ, ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণের সাথে মতবিনিময় সভা, গণশুনানি ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রতিবছরই হোটেল রেস্টুরেন্ট মালিক, বেকারি মালিক, ফল ব্যবসায়ী, মিষ্টি ব্যবসায়ী, কসমেটিকস দোকান মালিক, এলপিজি ডিলার ও পরিবেশক সমিতি এবং ইলেক্ট্রনিক পণ্যসামগ্রী ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সাথে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মতবিনিময় করে যাচ্ছে। জনসাধারণকে সচেতন করার জন্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ; ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমাম প্রশিক্ষণ, পুলিশ প্রশিক্ষণ ও আনসার ভিডিপি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণার্থীদের সাথে এবং বাজার এলাকায় মতবিনিময় করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রতিটি ইউনিয়ন কমিটিকে কার্যকর করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে এবং কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

 

 

-২-

 

            এত সব উদ্যোগ স্বত্ত্বেও বিশাল ভোক্তার এ দেশে প্রতিনিয়ত আমাদের নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যেমন- ইটের পরিমাপে কম দেওয়া, পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি কম দেওয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অননুমোদিত ঔষধ বিক্রি করা, মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশক ও সার বিক্রয়, মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার, অধিক বিদ্যুৎ বিল, চালের বস্তা ওজনে কম দেওয়া, ভেজাল মিশ্রিত খাদ্য প্রস্তুত, নকল ঔষধ ও কসমেটিকস তৈরি ও বিক্রয়, খাদ্যপণ্যে ফরমালিনের ব্যবহার, পঁচা-বাসি খাদ্যদ্রব্য বিক্রি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য সংরক্ষণ ও তৈরি, কলা পাকাতে কার্বাইড ব্যবহার, মোবাইল ডাটা প্যাকেজ নিয়ে প্রতারণা, মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা প্রতারণা, পরিবহণখাতে স্বেচ্ছাচারিতা, দই ও মিষ্টির প্যাকেটের অধিক ওজন, সোনালি মুরগিকে দেশি মুরগি বলে বিক্রি, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে মেয়াদোত্তীর্ণ কেমিক্যাল ব্যবহার, প্রশিক্ষণবিহীন টেকনিশিয়ানের মাধ্যমে ল্যাব টেস্ট ইত্যাদি।

 

            বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্মার্ট পণ্য এবং ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশে ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থার পরিসর অত্যন্ত সীমিত হলেও ধীরে ধীরে পরিধি বাড়ছে। ইতিমধ্যে ই-কমার্স, ই-স্বাস্থ্য, ই-টিকেটিং, ই-ভ্রমণ, ই-সার্ভিসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিজিটাল সুবিধা ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু এক্ষত্রে যথাযথ সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন সেট, ইন্টারনেট ডাটা প্যাকেজ, রাইড শেয়ারিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-ব্যাংকিং, এটিএম, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডসহ স্মার্ট ডিভাইসগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

 

            পরিশেষে উৎপাদনকারী, ব্যবসায়ী বা বিক্রেতা যেই হই না কেন সকলের আগে আমরা সবাই ভোক্তা। সবাই মিলে নিজেদের অধিকারগুলো নিশ্চিত করার জন্য একসাথে কাজ করে যাওয়া হোক সকলের মূল লক্ষ্য। জনসাধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আইনটি বাস্তবায়নে জনসাধারণকেই এগিয়ে আসতে হবে।

 

#

 

০৩.০৪.২০১৯                                                                                                                        পিআইডি প্রবন্ধ

সকল সাঁকো সেতু’য় রূপান্তর

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান

 

 

 

          ‘সেতু’ বন্ধন সৃষ্টি করে। সামাজিক, মানবিক এবং অবকাঠামোগত বন্ধন। আবার স্বাধীনতা যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর অস্ত্র ও রসদ পরিবহণে বিঘ্ন ঘটাতে অনেক সেতু উড়িয়ে দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর শুরু হয় নতুন করে সেতু নির্মাণ, যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়ন। বঙ্গবন্ধু সেতুসহ অনেক বড়ো বড়ো সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করে সামর্থ্য অনুযায়ী নির্মাণ কাজ শুরু হয়। সময়ের চাহিদায় জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে বর্তমানে ইউনিয়নের গ্রাম পর্যন্ত সড়ক/রাস্তার যোগাযোগ ব্যাপৃত হয়েছে। বেড়েছে সেতু/কালভার্ট নির্মাণের চাহিদা।

 

            বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থার মাধ্যমে এ যাবৎ যেসব সেতু নির্মাণ হয়েছে তার একটি সংক্ষিপ্ত রূপ এমন- ১৯৮২-৮৩ থেকে ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি পিএল-৪৮০ টাইটেল-২, ৩ এর আওতায় মোট ১৩,৭৭৭ কিমি দৈর্ঘের ৯৬৩টি সেতু; ১৯৮৩-৮৪ থেকে ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছরে মার্কিন উন্নয়ন সংস্থা কেয়ার পিএল-৪৮০ টাইটেল-২ এর আওতায় ১১,৮৮৪ কিমি দৈর্ঘের ৪৯৩৮টি সেতু; ১৯৯৪-৯৫ থেকে ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি পিএল-৪৮০ টাইটেল-৩ এর আওতায় ১২৫৪ কিমি দৈর্ঘের ৭,৫০৯টি সেতু; ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে কাজের বিনিময় খাদ্য কর্মসূচির আওতায় ১৮,২৪৫ কিমি দৈর্ঘের ২১৩৮টি সেতু; ২০০৫-০৬ থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে গ্রামীণ রাস্তায় ছোটো ছোটো সেতু নির্মাণ (কম-বেশি ১২মি) এর আওতায় ৭৪,৫৬৪ কিমি দৈর্ঘের ৮০৯৬টি সেতু; ২০১০-১১ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর পার্বত্য অঞ্চলে ৮৯৩৬ কিমি দৈর্ঘের ৮৪০টি সেতু নির্মাণ করা হয়। (সূত্র : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, গ্রামীণ রাস্তায় ১৫ মিটার পর্যন্ত ব্রিজ/কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্প)

                                                                                                   

            স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জানা যায়, ১৯৮৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তারা ১৩,৪০,১৭৪ কিলোমিটার সেতু নির্মাণ করেছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ করেছে প্রায় ১১ হাজার সেতু/কালভার্ট।

                                                                                                   

            যে বাংলাদেশে একসময় খুব অল্পসংখ্যক রাস্তা ও সেতু ছিল, উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় তার পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে গ্রামের বাড়িতে অনায়াসে গাড়ি নিয়ে চলে যাওয়া যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার এ উন্নয়ন গ্রামীণ অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থাকে পাল্টে দিয়েছে। গ্রামের মানুষের চলার পথকে সহজ ও গতিশীল করেছে, সময় বাঁচিয়ে দিয়েছে। দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণসামগ্রী প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দিতে যুগান্তকারী অবদান রাখছে।

                                                                                                   

            জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ ফোরাম। কাউন্সিলের এক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন দেশের সকল সাঁকো’কে সেতুতে রূপান্তরের। তিনি বলেন বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এ অগ্রযাত্রায় সবাইকে সমান সুযোগ করে দিতে হবে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে। তাই সবার আগে গ্রামের উন্নয়ণে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

                                                                                                   

           

            প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ২০১৮ ও ২০১৯ সাল-এ দু’বছরের মধ্যে ১৩ হাজার সেতু/কালভার্ট নির্মাণের পদক্ষেপ নিয়েছে। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি এবং “ইমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন প্রোগ্রাম ফর দ্য পুওরেস্ট (ইজিপিপি)” শীর্ষক কর্মসূচির মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। সেতু/কালভার্ট নির্মাণ করে জলাবদ্ধতা দূরীকরণ; পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে দুর্যোগজনিত ঝুঁকি হ্রাসকরণ; দেশের স্থানীয় হাটবাজার, গ্রোথসেন্টার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইউনিয়ন পরিষদের সাথে রাস্তাসমূহের সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে কৃষি উপকরণ সহজভাবে পরিবহণ ও বিপণনে সহায়তা প্রদানসহ গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন; এবং অবকাঠামো নির্মাণকালীন সাময়িক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে গ্রামীণ এলাকায় দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ব্রিজ/কালভার্টগুলো করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১০,৪৫০টি সেতুর কাজ সমাপ্তির পথে।

 

           

 

 

-২-

 

            বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ সাঁকোমুক্ত করতে লক্ষাধিক ছোটো-বড়ো সেতু/কালভার্ট নির্মাণ প্রয়োজন। নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় এর সংখ্যা বাড়তেই পারে। এর মধ্য থেকে ১৩ হাজার সেতু নির্মাণ হলে মূল প্রয়োজন মিটে যাবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় নতুন করে আরও ১৩ হাজার সেতু/কালভার্ট নির্মাণের প্রকল্প তৈরি করছে।  

                                                                                                   

            প্রকল্পটির মাধ্যমে মোট ১৩ হাজার সেতু/কালভার্ট নির্মিত হলে গ্রামীণ জলাবদ্ধতা দূর করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং গ্রামীণ এলাকায় স্থানীয় হাটবাজার, গ্রোথসেন্টার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইউনিয়ন পরিষদের সাথে সুষ্ঠু যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এতে কৃষি উপকরণ সহজভাবে পরিবহণ, উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিপণন, স্থানীয় ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ তথা শিক্ষার প্রসার এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। তাছাড়া, দুর্যোগকালীন সময়ে জনসাধারণ ও গবাদিপশুর দ্রুত নিরাপদ স্থানে পৌঁছার সুবিধা বৃদ্ধি পাবে। 

                                                                                                   

            ‘সাঁকো পার হতে গিয়ে শিক্ষার্থী খালে’, ‘সেতুর অভাবে ৪০ হাজার গ্রামবাসীর দুরবস্থা’, কিংবা ‘সেতু না থাকায় ত্রাণসামগ্রী পাঠানো যাচ্ছে না’- এ ধরনের সংবাদ প্রায়শই দেখা যেতো। প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশ সে অবস্থা পেরিয়ে প্রত্যেক গ্রামে ছোটো-বড়ো সেতু নির্মাণ করে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপনের মাধ্যমে উন্নয়নের মহাসড়কে উপনীত করেছেন। আশা করা যায়, অচিরেই প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রত্যেক সাঁকো সেতু’য় রূপান্তর হবে, এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

 

#

১২.০৩.২০১৯                                                                                                                        পিআইডি প্রবন্ধ

 

 

 

 

নির্যাতিত নারীর পাশে মহিলা সহায়তা কেন্দ্র

জিনাত আরা আহমেদ

 

            খুলনার মহেশ্বর পাশার জেসমিনের হাতের কাজ দেখে প্রশংসা না করে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম কীভাবে শিখলে? হাতের কাজ এত সুন্দর হয়! বলল, মহিলা সহায়তা কেন্দ্রে শিখেছি । কিভাবে এই সহায়তা কেন্দ্রের খোঁজ পেয়েছে জানতে চাইলে বলল- বিয়ের পর শাশুড়ী-ননদের গঞ্জনা এবং এক পর্যায়ে স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে জেসমিন খুলনার মহিলা বিষয়ক অফিসে যায় সমস্যার বিষয়ে জানাতে। ওরা ওকে মহিলা সহায়তা কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। সেখানে প্রায় চারমাস অবস্থানকালে জেসমিন হাতের কাজে পারদর্শী হয়ে ওঠে। এর মধ্যে মহিলা সহায়তা কেন্দ্র জেসমিনের স্বামী, শাশুড়ী এবং বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগ করে ওদের আসতে বলে। কেন্দ্রের আইনজীবীর সহায়তায় আলোচনা এবং আইনি আপস মীমাংসার মাধ্যমে কিছুদিন পর জেসমিনের স্বামী ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বর্তমানে আলাদা সংসারে স্বামীর উপার্জন এবং জেসমিন হাতের কাজ করে যে টাকা আয় করে তাতে সুখেই দিন কাটছে ওদের।

 

            জেসমিনের মতো এমন নির্যাতিত নারীর সংখ্যা এদেশে কম নয়। এসব অসহায়, দুঃস্থ, আশ্রয়হীন ও নির্যাতিত মহিলাদের সাহায্যের জন্য সরকারের অসংখ্য কর্মসূচি রয়েছে। এসবের মধ্যে প্রধানত আইনগত সহায়তা ও আশ্রয় প্রদানের লক্ষ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে আছে মহিলা সহায়তা কর্মসূচি নামে বিশেষ কার্যক্রম। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আওতায় বিভাগীয় পর্যায়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল এবং নির্যাতিত নারীদের সাময়িক অবস্থানের জন্য যেখানে আবাসন কেন্দ্রের মাধ্যমে অসহায়, দুঃস্থ, আশ্রয়, নিরাপত্তাহীন এবং নির্যাতিত মহিলাদের আইনগত সহায়তা এবং আশ্রয় সহায়তা দেওয়া হয়ে থাকে। সম্পূর্ণ বিনা খরচে এসব মহিলাদের আইনগত সহায়তা এবং আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার ব্যবস্থা করা হয়।

 

            উল্লেখ্য, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে ১৯৮৬ সালে নির্যাতিত নারীদের আইনগত পরামর্শ ও সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ১৫ জন আইন কর্মকর্তার সমন্বয়ে চারটি পদ নিয়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের কার্যক্রম শুরু হয়। এ কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী ও বেগবান করতে মহিলা সহায়তা কর্মসূচি প্রকল্প নামে একটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ছয়টি বিভাগীয় শহরে ছয়টি সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। নির্যাতনের শিকার নারীরা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের মাধ্যমে কাউন্সেলিং, বিরোধ নিষ্পত্তি, দেনমোহর, স্ত্রীর ভরণপোষণ, খোরপোশ ও সন্তানের ভরণপোষণ আদায়ে সহযোগিতা পেয়ে থাকে। তাছাড়া নির্যাতিত ও আশ্রয়হীন নারীরা বিনা খরচে ছয় মাস পর্যন্ত বারো বছরের নিচে সর্বোচ্চ দুই সন্তানসহ আশ্রয় পেতে পারেন।

 

            নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলে নিয়োজিত ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ পরিদর্শক, আইনজীবী এবং সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা দ্বারা নির্যাতিত নারীদের অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত পরামর্শ দেওয়া হয়। তাছাড়া পারিবারিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন, যৌতুকের কারণে সৃষ্ট পারিবারিক সমস্যা নিরসন, স্ত্রী-সন্তানের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বিবাহ বিচ্ছেদ কিংবা তালাকপ্রাপ্ত নারীদের মোহরানা ও খোরপোশ আদায় ইত্যাদি বিষয়ে অভিযোগকারীর লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে আপস নিষ্পত্তি করা হয়। এক্ষত্রে বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে পারস্পরিক আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে সেল বিষয়গুলো আপস নিষ্পত্তি করে থাকে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সেলের যেসব অভিযোগ নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয় না তা বিনা খরচে এ কার্যালয়ের আইনজীবীর মাধ্যমে নির্যাতিতের পক্ষে আদালতে মামলা পরিচালনা ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হয়। এসবের পাশাপাশি দৈনন্দিন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন নারী নির্যাতনমূলক অপরাধের তথ্য সংগ্রহ ও ফলোআপ করা হয়।

 

            মহিলা সহায়তা কেন্দ্রে বিনা খরচে নির্যাতিত নারীদের আশ্রয়ের জন্যও সুব্যবস্থা রয়েছে। আশ্রিত নারী ও শিশুদের বিনামূল্যে খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়। অসহায় ও দুঃস্থ মহিলারা যাতে স্বাবলম্বী হতে পারে সেজন্য আশ্রয়কেন্দ্রের ট্রেড প্রশিক্ষকের মাধ্যমে সেলাই, কাটিং, এমব্রয়ডারি, উল বুনন ইত্যাদি বিষয়ে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এখান থেকে লব্ধজ্ঞান কাজে লাগিয়ে পরবর্তীতে নারীরা আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত হতে পারবেন।

 

            সবক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি এবং নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার জন্য নারীর ক্ষমতায়নে সরকার বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতায়ন হলো নারীর রক্ষাকবচ। এতে করে একজন স্বাবলম্বী নারীর সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা তৈরি হয়। তাই নির্যাতনের শিকার অসহায় নারীর পাশে দাঁড়িয়েছে সরকার। দুঃস্থ নারীকে বিচার পেতে সাহায্য করাই শুধু নয় বরং নিরাপদ আশ্রয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারবেন একজন অসহায় নারী। তাই নির্যাতিত মহিলা ও তাদের অভিভাবকদের যেকোনো সহায়তা দিতে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মহিলা সহায়তা কেন্দ্র রয়েছে সার্বিকভাবে সচেষ্ট।

 

 

-২-

 

            নারীরা যখন অধিকার আদায়ের ব্যাপারে সচেতন হবে তখন আশেপাশের মানুষগুলো অন্তত নড়েচড়ে বসবে। কোনো কিছু চাপিয়ে দিতেও তারা ভাববে। এখন সময় এসেছে নারীদের নিজেদের অধিকার বুঝে নেয়ার। আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা যদিও কর্তৃত্বের সুযোগ থেকে পিছিয়ে আছে তথাপি এগণ্ডি থেকে নারীদের নিজে থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নারীর প্রতি সংহিসতা রোধে নারীদেরকেই কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে। পরিবারে বোঝা না হয়ে নিজেকে শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী করতে হবে।

 

#

 

১২.০৩.২০১৯                                                                                                                                                              পিআইডি প্রবন্ধ

 

 

 

শিশুর বিকাশে চাই পুষ্টিকর খাবার

সেলিনা আক্তার

 

            আজকের শিশু আগামী দিনের পরিণত মানুষ। আগামীতে বিশ্ব পরিচালনায় নেতৃত্ব দেবে। সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে তারা রাষ্ট্রের সম্পদ। শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ। শিশুর সুষ্ঠু বিকাশ নিশ্চিত হলে রাষ্ট্র ও জাতির ওপর তার প্রত্যক্ষ ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই এ অমূল্য সম্পদ রক্ষা করে তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার বিষয়টি জরুরি।

 

            শিশুর সুস্বাস্থ্য গঠনে পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অনেক। শিশুকে উন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে রাখতে হবে। তবেই শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সুষ্ঠু হবে। শিশুর স্বাস্থ্য বিকাশের অনুকূল পরিবেশ চাইলে মায়েদের কথাও ভাবতে হবে। মা যদি সুস্থ থাকে ও পুষ্টিসম্পন্ন খাবার গ্রহণ করে তাহলে মায়ের গর্ভে থাকা শিশুটিও ভালো থাকবে। সুস্থ মা-ই পারে একটি সুস্থ জাতি উপহার দিতে।

 

            ‘পুষ্টিহীনতা’ কিংবা ‘অপুষ্টি’ শব্দগুলোর সাথে আমাদের সবাই কমবেশি পরিচিত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অগণিত শিশু, বৃদ্ধ, যুবকরা অপুষ্টিতে ভুগছে। আমরা এর ব্যতিক্রম নই। ‘পুষ্টি’ শব্দটি খুব শোনা গেলেও আমরা এর সঠিক সংজ্ঞা খুঁজি না। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে শরীরে খাদ্য শোষিত হয়ে তাপ ও শক্তি উৎপন্ন হয়। ফলে শরীরে বৃদ্ধি ঘটে। সর্বোপরি, উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে পুষ্টি শোষণ হলেই দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।

 

            পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে চাইলে অপুষ্টি বিষয়েও জানতে হবে। আমরা বিভিন্ন ধরনের খাবার গ্রহণ করে থাকি। তবে সব কিছুরই একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে, যেটুকু গ্রহণে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিংবা কম খাবার গ্রহণ করলে দেহে যে তারতম্য ঘটে তাকেই অপুষ্টি বলে। অপুষ্টি কেবল শারীরিক কিংবা পারিবারিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক এমনকি অর্থনৈতিক সমস্যাও তৈরি করতে পারে। আবার অপর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণ কিংবা ঘন ঘন অসুখ হলে কম পুষ্টিজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার গ্রহণ এবং সাথে সাথে শারীরিক পরিশ্রম না করলে পুষ্টির বাড়তি কিংবা অতিপুষ্টিও হতে পারে। 

 

            একটি শিশুর জন্মের সময় সাধারণত ওজন ৩ থেকে ৩.৫ কেজি থাকে এবং উচ্চতা থাকে ৪৯ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার। যদি ঠিকমতো শিশুকে পুষ্টিকর খাবার দেওয়া যায় তাহলে ৫ মাস বয়সে ওজন দ্বিগুণ হয় এবং এক বছরে ওজন হয় তিনগুণ। এই হিসেবে ৫ মাস বয়সে একটি শিশুর ওজন হওয়া উচিত ৫ থেকে ৭ কেজি এবং এক বছরে ৯ থেকে ১০ কেজি। সেই সাথে উচ্চতা হবে ৫ মাসে ৬৫ থেকে ৬৭ সেন্টিমিটার এবং ১২ মাস বয়সে ৭৪ থেকে ৭৬ সেন্টিমিটার। শিশুর প্রথম ৬ মাসে কেবল মায়ের দুধই তার জন্য একমাত্র পুষ্টিকর খাবার। ৭ মাস বয়স থেকে শিশুকে ফলের রস, সবজি, প্রোটিন ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার, ডিমের কসুম এবং ভাত, ডাল, সবজি ও তেল। এই খাবারগুলো নরম করে শিশুকে তার উপযোগী করে খাওয়াতে হবে।

 

            পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এমন শিশুদের দেখলেই বুঝা যায়। কারণ এসব শিশুদের পরিপূর্ণ শারীরিক বিকাশ হয় না। এরা বয়সের তুলনায় খাটো ও কম ওজনবিশিষ্ট এবং পর্যাপ্ত উচ্চতা থাকলেও কম ওজনবিশিষ্ট হয়ে থাকে। অপুষ্টির শিকার হলে অনেকগুলো লক্ষণই প্রতীয়মান হয়- দুর্বল ও চুপচাপ থাকা, রোগা, ঘাড় ও পাজরের হাঁড় স্পষ্ট চোখে পড়া, কুচকানো চামড়া, রগচটা ও খিটমিটে মেজাজ, হাত-পায়ে পানি আসা, ক্ষুধামান্দ্য রোগ ইত্যাদি।

 

            বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু পুষ্টিহীনতায় ভোগে। এদের বেশির ভাগেরই প্রোটিন ও ক্যালরির ঘাটতি রয়েছে। এদের প্রায় ৩৫ শতাংশ খাটো, ৩৩ শতাংশ কম ওজনবিশিষ্ট এবং প্রায় ১৫ শতাংশ রোগা-পাতলা গড়নের।

 

            মাতৃগর্ভ থেকে কিংবা জন্মের পর সঠিক খাবার সুষম উপাদানে না পেলেও শিশু অপুষ্টির শিকার হয়ে থাকে। তবে যেভাবেই হোক না কেন, এর প্রভাব সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি-সব কিছুর ওপরই পড়ে। মহিলাদের বেশির ভাগেরই জিংক, আয়রণ, আয়োডিনের স্বল্পতা দেখা যায়। এ সমস্যাগুলো সবক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। ২৬ শতাংশ মহিলাই রক্তস্বল্পতায় ভোগে। পাঁচ বছরের নীচে শিশুদের প্রায় ৩৩.১ শতাংশই রক্তস্বল্পতায় ভোগে। তবে বর্তমানে আয়োডিনের অভাবে যেসব রোগ হতো সেগুলো কমেছে অনেকাংশে। শিশুদের মায়ের দুধ এবং সঠিক ও যথাযথ পরিমাণে পরিপূরক খাবার দেওয়া হলে এই সামাজিক সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হবে। অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ, খাবার নির্বাচনে অজ্ঞতা এবং একই ধরনের খাবার বার বার গ্রহণে সমস্যা বাড়ে। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের প্রতি যত্মবান হতে হবে। এসব শিশুর মৃত্যুহার স্বাভাবিকের চেয়ে ৯ গুণ বেশি। সচেতনতা বাড়ালে তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

 

 

-২-

 

            মেয়ে শিশুদের খাদ্য, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া না গেলে তাদের দৈহিক আকার ছোটো হয়ে যায় অর্থাৎ খর্বাকৃতির হয়। এরা এই অপুষ্টি নিয়েই বাড়তে থাকে। এটি একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া, কারণ প্রাথমিক অবস্থায় যদি ঠিকভাবে পুষ্টিকর খাবার না পায় তবে সেই মেয়ের অপুষ্ট শিশুর জন্ম দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আবার এই অপুষ্টি নিয়ে জন্মানো শিশু তার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে একইভাবে পৌঁছাবে। এভাবেই মেয়েদের মধ্যে অপুষ্টির দুষ্টচক্রটি ঘুরতে থাকে, যার পরিণতি ভয়াবহ।

 

            আমাদের দেশে এখনো আঠারো না পেরুতেই অধিকাংশ মেয়ের বিয়ে হয়। অথচ আঠারো বছরের নিচে কোনো মেয়ে সন্তান ধারণের জন্য সম্পূর্ণ তৈরি থাকে না। ১৮ বছরের নীচে গর্ভধারণ নিরাপদ নয়। ১২ বছর বয়স থেকে মেয়েদের প্রজননঅঙ্গ সন্তানধারণ উপযোগী হতে শুরু করে এবং পূর্ণতা পায় ১৮ বছর বয়সে। এ সময় অবশ্যই মেয়েদের পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার দিতে হবে যেন তার শারীরিক বিকাশ সঠিক হয়। তবেই সে সুস্থ শিশু জন্ম দিতে পারবে। নারী-পুরুষের বৈষম্যের কারণে কোনো মেয়ে শিশু যাতে অপুষ্টির শিকার না হয় সে দিকে সবার নজর দিতে হবে। ১৮ বছর বয়সের নিচে গর্ভধারণের ফলেই আমাদের দেশে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার উন্নত দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। এ সমস্যা উত্তরণে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করে তোলার পাশাপাশি প্রজননস্বাস্থ্য ও পুষ্টির বিষয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ এবং জাতিকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। জনগণকে এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কিন্তু এটিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হলে সরকারের পাশাপাশি এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। বিশেষ করে সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন মিডিয়ার ভূমিকা এখানে অনস্বীকার্য।

 

            শিশুদের অপুষ্টি প্রতিরোধে কিশোরী, গর্ভবতী মা এবং দুগ্ধদানকারী মায়ের যথাযথ পুষ্টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অল্পবয়সে বিয়ে না দিলে সমস্যাগুলো কমে আসবে, বাল্যবিয়ে দেওয়ার ফলে অল্পবয়সে মা হলে শিশু ও মা দুজনই অপুষ্টিতে ভোগে।

 

            গর্ভবতীর খাদ্যাভাসে ও ঔষধ গ্রহণে সচেতন হতে হবে। আয়রণ, জিংক গ্রহণ না করলে শারীরিক নানান সমস্যা তৈরি হবে। শুধু তাই নয় এ সময় পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম প্রয়োজন। পারিবারিক মহলও হতে হবে সুখকর। শিশুর অপুষ্টি প্রতিরোধে তার জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শালদুধ পান করাতে হবে। জন্মের পর প্রথম ৬ মাস শুধুই মায়ের দুধে শিশু বড়ো হবে। ৬ মাস পূর্ণ হলে শিশুদের উপযোগী বাড়তি নরম খাবার দিতে হবে। তবে দুই বছর পর্যন্ত মায়ের দুধ পান করাতে হবে। তাকে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধী টিকাগুলো সময়মতো দিতে হবে।

 

            আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত আবশ্যক। কাজেই একটু সচেতন হলেই শিশুর জন্য পুষ্টিকর ও সুষম খাবার নিশ্চিত হবে। তবেই আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম স্বাস্থ্যবান, বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রতিভার অধিকারী হবে, দেশ গঠনে সফল অবদান রাখতে পারবে। সকলে এ বিষয়ে সচেতন হলেই দেশে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার এবং অপুষ্টির অভাব হ্রাস পাবে।

 

#

 

১২.০৩.২০১৯                                                                                                                                                              পিআইডি প্রবন্ধ

 

 

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশ

সিকান্দার আবু জাফর

 

            সারাবিশ্বে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় জলবায়ু পরিবর্তন। প্রতিনিয়ত ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশের নেতিবাচক পরিবর্তনে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে এবং দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। এ উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ নামক ‘হটস্পট’টি দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে বিশ্বের ষষ্ঠ স্থানে অবস্থান করছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বিষয়ক বিশ্বব্যাংকের 'Turn Down The Heat : Climate Extremes Regional Impacts and the Case for Resilience' শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি ৩-৫ বছর পর পর বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা বন্যায় ডুবে যাবে অর্থাৎ প্লাবিত এলাকার পরিমাণ বাড়বে ২৯ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা অনেক বাড়বে এবং তিন মিটার উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস নিয়ে উপকূলে আঘাত হানবে। এতে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে।

 

            ২০৮০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৬৫ সে. মি. বাড়লে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ৪০ শতাংশ ফসলি জমি হারিয়ে যাবে। এ ছাড়া তাপদাহ ও খরার পরিমাণ বাড়বে। ১০ শতাংশ ধানের জমি এবং ৩০ শতাংশ গমের জমি হ্রাস পাবে। জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস হবে, রোগ-ব্যাধির বৃদ্ধি ঘটবে। বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রার দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও গত কয়েক বছরে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক আচরণ সেই পরিচিতিকে ম্লান করেছে।

 

            WWF-এর গবেষণায় দেখা যায়, শুধু ঢাকা শহরে ১৯৯৫ সালের মে মাসের তুলনায় ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসের তাপমাত্রা বেড়েছে ১.৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১৬ সাল ছিল শতাব্দীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রার বছর। এ বছরের গড় তাপমাত্রা ছিল ১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সূত্রমতে- ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের তাপমাত্রা গড়ে ১.৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২১০০ সাল নাগাদ ২.৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

            বর্তমানে দেশের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের ৩৩টি জেলা বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। উন্নত বিশ্বের গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমনকারী দেশগুলো যেমন- চীন (২৫.৯৩%), যুক্তরাষ্ট্র (১৩.৮৭%), ভারত (৬.৪৩%), রাশিয়া (৪.৮৬%) জলবায়ু পরিবর্তনে প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ এবং তৃতীয় ও চতুর্থ বিশ্বের দেশসমূহের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের ভূমিকা বর্তমান বিশ্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এসডিজি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করতে উন্নয়নশীল বিশ্বের নবীন দেশটি দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে নিজেকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।

 

            বাংলাদেশ UNFCCC-এর সদস্য দলগুলো নিয়ে প্রতিবছর আয়োজিত COP সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করে আসছে। ২০১৫ সালের COP-21 সম্মেলনে গৃহীত প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বাংলাদেশ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের প্রথম দিনেই স্বাক্ষর করেছে। বিশ্বের চতুর্থ দেশ হিসেবে ২০১৩ সালের কিয়োটো প্রটোকলের দ্বিতীয় মেয়াদে (২০১৩-২০২০) অনুসমর্থন করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নিজেদের অবস্থান বিশ্বের দরবারে জানান দিতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে 'Economics of Adaptation to Climate Change : Bangladesh' অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা মোকাবিলায় ২০৫০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে মোট ১৬৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অতিরিক্ত অর্থায়ন প্রয়োজন হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে সরকার জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে Bangladesh Climate Change Strategy and Action Plan 2009 প্রণয়ন করে ৬টি বিষয়ভিত্তিক ৪৪টি কার্যক্রম নির্ধারণ করে কাজ করছে।

 

            বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে ২০১০ সালের জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল গঠন করেছে। এ তহবিলে ২০১০ সাল থেকে মার্চ ২০১৮ পর্যন্ত মোট ৩,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যখন বিশ্বের কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো নিজেদের ব্যাপারে নীরব তখন বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক সহায়তায় ১০ শতাংশ এবং নিজস্ব অর্থায়নে ৫ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ব্যাপক শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

 

 

 

-২-

 

 

            বাংলাদেশ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জলবায়ু অর্থায়নে ১.৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে যা ঐ বছরের বাজেটের ৬.৩৬ শতাংশ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার গুরুত্ব অনুধাবন করে ২০১৮ সালের ১৪ মে মন্ত্রিসভায় বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় নামকরণ করে জলবায়ু সংক্রান্ত বিষয়টির প্রশাসনিক ভিত্তি প্রদান করা হয়েছে, যা তৃতীয় বিশ্বে নজিরবিহীন। এ ছাড়াও বর্তমান সরকার ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২০টি মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দে জলবায়ু অর্থায়ন নিরূপণপূর্বক একটি প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

 

            সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ নিশ্চিত করার জন্য এমন একটি সর্বজনীন সমাধান দরকার, যাতে এর অধিবাসীরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারে।

 

#

 

১২.০৩.২০১৯                                                                                                                                                              পিআইডি প্রবন্ধ

 

 

Feature Weabsite.pdf Feature Weabsite.pdf

Share with :

Facebook Facebook